‘আসা যাওয়ার পথের ধারে…!’ When Doctor produces Doctors.

প্রত্যেক মানুষের জীবনে কোনোও না কোনো একটি দূর্বল জায়গা রয়ে যায়। ব্যক্তি চায় সেই জায়গাটা থাক লুক্কায়িত, চরাচরে অধরা। তাই সে সতত প্রয়াস করে সেই জায়গাটি এড়িয়ে চলতে। অপরপক্ষে সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা কখনো অজ্ঞাতসারে অথবা কেউ জেনেশুনে আলোচনা সমালোচনার জন্য, আবার কখনও সমবেদনা জানানোর বাহানায় অহরহ সেই নঞর্থক জায়গায় আঘাত হেনে একপ্রকার বিকৃত মানসিকতার সুখানুভুতি(?) লাভ করে থাকে! অজ্ঞাতসারে ঘটে গেলে সঙ্গে সঙ্গে মোড় ঘুরিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে নেওয়াই কাম্য,সহাভূতির আলোচনা ও আর না করা উত্তম। কিন্তু যারা জেনেবুঝে এমন আচরণ থাকে, তারা একপ্রকার বিকৃত মানসিকতার শিকার!  মানবতার দৃষ্টিতে একে এক অমানবিক দুরাচার বলা যেতে পারে, যা পরিত্যাজ্য এবং তা বেঁচে থাকার জন্য যত্নশীল হওয়া অবশ্যই কাম্য।            

ঘটনা বলি। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দ। যতদূর মনে পড়ে অনন্যা এক্সপ্রেস। আগ্রা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ছেড়েছে বিকেলবেলা- চারটার আশেপাশে। কলকাতা পর্যন্ত প্রায় চব্বিশ ঘন্টার যাত্রা। টিকিট ছিল এসি টু-টায়ারে। আমার লোয়ার বার্থ। সামনের দুটোতে এক দম্পতি। আপাতত বসে পড়লাম সিটারে। খানিক পরিচিতি। গপসপ। বাঙালি হওয়াতে উভয় পক্ষের সুবিধা। জানা গেলো আমার মতো তাঁরাও গতকাল আগ্রা এসেছিলেন দিল্লি থেকে। অবশ্য তার আগেরদিন তাঁরা ফিরেছেন দুবাই থেকে। ঘুরতে গিয়েছিলেন।        

একটা জিনিষের খটকা লেগে রয়েছিল আমার মনে- লাগেজ টিকিটে দুজনেরই নামের আগে লিখা DR., কিন্তু টাইটেল ভিন্ন । একজনের চ্যাটার্জি, অন্যজনের সেন। যা সাধারণত হিন্দু দম্পতির ক্ষেত্রে হয় না। ভাবলাম- হতে পারে ভদ্রমহিলা বিয়ের আগের টাইটেলই ব্যবহার করছেন, এফিডেভিটের ঝঞ্ঝাটে আর যান নি।        

প্রাথমিক আলাপচারিতার পর যখন খানিকটা ফ্রি হলাম, জিজ্ঞেস করলাম- কিছু মনে করবেন না, আপনারা কি ফিজিশিয়ান, নাকি জেনারেল পিএইচডি ডক্টরেট? ভদ্রলোক বললেন যদি বলি দুটোই। বুঝলাম। বললাম- তারমানে প্রাথমিকভাবে আপনারা ফিজিশিয়ান ই। -হ্যাঁ, আমরা দুজনই গায়নিকোলজির ডাক্তার, তবে পোস্ট ডট্টরেল ডিগ্রি করেছি রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজির উপর। খানিক ঘাবড়ে গিয়ে কিছুক্ষন নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলাম। বাপরে, এতো উঁচু ডিগ্রি হোল্ডারদের সাথে যাত্রা!       

 ডঃ চ্যাটার্জি একসময় জিগ্যেস করলেন আমার যাত্রার উদ্দেশ্য ? নাকি স্রেফ তাজমহল দেখতে ? বললাম এএমইউতে ছেলের  বি.টেক এ্যন্ট্রেন্স এর কথা। আমার দিল্লিতে কিছু কাজ ছিল, তাই ছেলে তার বন্ধুদের সঙ্গে চলে যাচ্ছে কলকাতা। সেখান থেকে একসাথে ধরবো কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। মেয়ের পড়াশোনার কথাও আলোচনা হলো ।        স্বভাবতই এরপর বললাম- আপনাদের বাচ্চাকাচ্চাদের পড়াশোনা হয়তো শেষ? -না, আমাদের সেই দায়ভার নেই !        

সঙ্গে সঙ্গে চুপটি মেরে গেলাম। দীর্ঘক্ষণ কারো মুখে কোনো কথা নেই!        রাত নয়টা বাজতেই ডঃ দম্পতি খাওয়া দাওয়া সেরে নিলেন। নিজেদের টিফিন ক্যারিয়ার খুলে। খাবার শেষে মিসেসকে তুলে দিলেন আপার বার্থে। খানিক পর আমার খাবার ও এসে গেলো। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লাম।        

আমার এক বদ অভ্যাস। শোয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম লেগে গেলে রক্ষে। নইলে খানিকক্ষণ পর হাঁটুতে কামড়ানো চিবানো শুরু হয়ে যায়। ঘুম চোখে আসছে না, বারেবারে একটি কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে! রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রাইনোলজির উপর পোস্ট ডট্টরেল ডিগ্রি করা এক নিঃসন্তান দম্পতি ! এ আবার জগতের কোন রহস্যময় ঘটনাচক্রের মোকাবেলা হলাম ! দির্ঘ দাম্পত্য জীবনে যারা স্বাভাবিকভাবে সন্তানের মুখ দেখতে পায়না, তারা তো এদের কাছেই যায়! অথচ….. ! ঘণ্টা খানেক বার্থে ছটফটানির পর আমার সেই চিবুনি শুরু হয়ে গেলো। বাথরুম করে এসে দেখি ডঃ চ্যাটার্জি ও বসে পড়েছেন। ফ্লাক্স খুলে কফি ঢালছেন। নেবো কি না জিজ্ঞেস করতে বললাম অবশ্যই। -ঘুম কেন হলো না। বললাম। কিছু ডাক্তারি পরামর্শ দিলেন বললেন পৌঁছাবার আগে মনে করতে, কিছু ওষুধ লিখে দেবেন। ধন্যবাদ দিয়ে আমার নিউট্রি চয়েসের প্যাকেট এগিয়ে দিলাম।        

কফি খাওয়া শেষ। এবার উনি বলতে শুরু করলেন। আমাদের সন্তান নেই জেনে আপনার খুব পীড়া হচ্ছে, না? ভাবছেন এতো পড়াশোনা তাহলে বেকার করলাম। ভাবছেন জ্যোতিষিদের মতো যারা সবার ভবিষ্যৎ বলে দেয়, রাশি ঠিকুজি ঠিক করে দেয়, কিন্তু পারেনা নিজেরটা সারাতে!

Also Read, Happy New Year Wishes 2021      

 -না না, সেরকম কিছু নয়। মানে, ভাবছিলাম নিশ্চয়ই কিছু টেকনিক্যাল প্রবলেম রয়েছে, এই আর কি!        -কিন্তু টেকনিক্যাল প্র্যাকটিক্যাল কিছুই তো আপনি জিজ্ঞেস করলেন না!        -সব কিছু জিজ্ঞেস করা যে ঠিক নয়, সেইটুকু অন্তত বুঝতে পারিনা বলে ধারণা করছেন?        -না, ঠিক এর উল্টোটা ভাবছি। ভাবছি এরকম মানুষ ও বুঝি আছে, সুযোগ পেয়েও অনুসন্ধিৎসা ছাপিয়ে রাখতে পারে? জানি আপনার মনের জিজ্ঞাসা,যা আপনার শালীনতা আটকে রেখেছে। যেহেতু আপনি ভিন রাজ্যের মানুষ, তাই বলতে আপত্তি নেই। শুনবেন, চলে যাবেন। গল্পের নিকেষ হয়ে যাবে। তাই শুনুন আমাদের জীবন-বিলাসের কথা।        

-এক অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসেছি আমি। সরকারি স্কুল থেকে সিনিয়র সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবার পর বন্ধুদের তাড়নায় বসলাম মেডিকেল এ্যন্ট্রেন্সে। যদিও জানি কোয়ালিফাই করলেও মেডিক্যাল পড়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। লরি ড্রাইভার বাবার পাঁচ সন্তানের বড় হয়ে আজ হোক অথবা কাল, পরিবার এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য কোনো না কোনো কাজ আমাকে ধরতেই হবে। উল্টো আমার পেছনে খরচ করার মতো অবস্থা আমার পরিবারের বিলকুল নেই। রেজাল্ট ভালো হয়ে গেলো। বাবার সাফ কথা, ঘরে থেকে, বাড়িতে খেয়েদেয়ে, ছোটদের পড়াশোনার খেয়াল রেখে যেটুকু পারো, সেভাবে ভর্তি হও। তার বেশি কিছু সম্ভব নয়।         

ভর্তির সময় একেবারে সন্নিকটে। মায়ের উল্টো সুর । তাঁর ছটফট বেড়ে গেলো। উনার এক কথা- যে করে হোক আমাকে মেডিক্যালে ভর্তি হতেই হবে। রোজ বেরিয়ে যান কোথাও। ফিরে আসেন অনেক দেরি করে। সেদিন বিকেলবেলা এসে বললেন, তোর ভর্তির টাকা যোগাড় হয়ে গেছে। আর প্রমোদ বাবু বলেছেন ভর্তিটা হয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যাঙ্ক লোন পেয়ে যাবি। কারো কাছে হাত পাততে হবে না। পুরো দুই হাজার টাকা তুলে দিলেন হাতে। রাতের বেলা যে করে হোক বাবার সম্মতি আদায় করে নিলেন।      

 নির্দিষ্ট দিনে …… মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। পরদিনই ব্যাঙ্কে গিয়ে স্টাডি লোনের আবেদন করলাম। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ বললেন প্রসেস করে তারা শীঘ্রই খবর দেবেন। তবে তার আগে ….মেইন ব্রাঞ্চে একটি একাউন্ট খুলতে হবে। তিন দিনের মাথায় একাউন্ট খোলাও হয়ে গেলো। মা ফের মামাবাড়ি থেকে কিছু টাকা এনে দিলেন হোস্টেল ফি জমা করতে। হোস্টেলে চলে গেলাম । ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিদিন ব্যাঙ্কে গিয়ে খবর নিচ্ছি- কবে হচ্ছে লোন স্যাঙ্কশন! আর কতদিন লাগবে? সব ছাত্ররা ডাবল সেট এ্যপ্রন বানিয়ে নিয়েছে। সুন্দর সুন্দর ইউনিফর্ম। পাঁচদিন হয়ে গেছে, আমি ক্লাসে যাচ্ছি বিনা ইউনিফর্ম, বিনা এ্যপ্রন! পাঁচ নম্বর দিন ক্লাসের শেষে একজন শিক্ষক, পরিচয় দিয়েছিলেন ডঃ অনুরাগ সেন, আমাকে একান্তে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন আমার সমস্যা কি? মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারছি না। অবশেষে ধমকি খেয়ে  সব খুলে বললাম।      

 – সন্ধ্যা ছয়টায় রেডি থাকিস, কেন্টিনের সামনে দেখা হবে। এক জায়গায় যেতে হবে আমার সঙ্গে।        ইউনিফর্ম, এ্যপ্রনই নয়, প্রাসঙ্গিক যাবতীয় আসবাবপত্র নিয়ে ফেরা হলো সেদিন। পরদিন সকালবেলা ব্যাঙ্কের যাবতীয় কাগজপত্র দিতে বললেন। প্রত্যয় জাগলো স্যার খবর নিলে লোন সেঙ্কশন হয়ে যাবে ইমিডিয়েট।        ক্লাসের শেষ বললেন- তোমার কাজ হয়ে গেছে, প্রতিমাসে ….. টাকা করে ঢুকবে তোমার একাউন্টে। পড়াশোনা এগিয়ে চললো। স্যার ব্যাঙ্কে যাওয়ায় একটি সুবিধা হলো, অন্য যারা স্টাডি লোন নিয়েছিল, তাদের প্রত্যেক সেমিস্টার শেষে কি কি অনেক কাগজপত্র জমা করতে হতো। আমার কিচ্ছু না।        

এভাবে এমবিবিএস শেষ হলো। এখনকার মতো রুরেল পোস্টিং ম্যান্ডেটরি ছিলনা আমাদের সময়। পিজি করার আবেদন করলাম। সিলেকশন পেয়ে গেলাম। গায়নিকোলজিতে। পাঁচ বছরে অনেক পাকা হয়েছি ভেবে ব্যাঙ্কে গেলাম- একাই। পিজির জন্য ও লোন হবে কি না খবর নিতে। তাজ্জব! জানতে পেলাম আমি কোনো লোন নিইনি! তাহলে ?        

নিজে তদন্তে নামার আগে তলব পড়লো অনুরাগ স্যারের ঘরে। কিছু বলার আগেই স্যার বললেন- জানতাম তুমি ব্যাঙ্কে যাবে। আসলে হয়েছিল কি, তোমার এপ্লিকেশনের কথা শুনে এক সজ্জন বললেন তিনিই লোন দিয়ে দেবেন- উইদাউট এ্যনি ইন্টারেস্ট। তাই আমি গ্রাণ্টার হয়ে তা করিয়ে দিয়েছিলাম। উনি আবার খবর দিয়েছেন তুমি পিজি করতে চাইলে আরও দুই বছরের জন্য লোন দিতে প্রস্তুত। কি করবে বলো?        

সম্মতি জানানো ছাড়া আমার গত্যন্তর ছিলনা। সেই সজ্জনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম একবার তাঁকে প্রণাম করতে চাই। স্যার বললেন- তোমার কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সামনাসামনি হতে ইচ্ছুক নন। তাই তোমার প্রণাম রেখে দাও আরোও দিনকয়েকের জন্য।        পিজি শেষ হতেই আমার পোস্টিং হয়ে গেলো জেলা হাসপাতালে। স্যার তখন বললেন লোনের শর্ত নাকি চাকুরি পাকা হবার দুই বছর পর থেকে রিফাণ্ড শুরু হবে। এবার মনে সন্দেহ জাগলো! কেন স্যার বারবার রহস্যাবৃত রাখতে চাইছেন লোনের ব্যাপারটা ? পরিমাণটা তো কম নয় একেবারে!        

সে যাই হোক, হাসপাতালে কাজ করছি। মাঝে মাঝে শহরে গেলে স্যারের সাথে দেখা করে আসি। ক্রিটিক্যাল কেস পেলে স্যারের ওখানে রেফার করে দিই । এমনি চলছিল। বছর দেড়েক পর স্যার একদিন ড্রাইভার দিয়ে গাড়ি পাঠালেন। এখুনি যেতে হবে।         সেদিন স্যারকে এতো বিমর্ষ দেখে প্রথমে আমার ভয় হয়েছিল! এতো হাসিখুশি উৎফুল্ল মনের মানুষ! আজ কেন এই চেহারা! হাত ইশারায় বসতে বললেন। কিচ্ছু বলছেন না। আমিও জিজ্ঞেস করবার হিম্মত করতে পারছিনা! এভাবে কেটে গেলো মিনিট কয়েক!        -অমল, ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করো। মুখ খুললেন স্যার। আমার রীতিমত হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেলো! -অমল, তোমাকে একটি বিশেষ দরকারে খবর করলাম। আমার জগত আমাকে হারিয়ে দিয়েছে! এই মুহূর্তে আমি বড্ড লাচার! সইতেও পারছিনা, না পারছি কাউকে কিছু বলতে! তাই তোমার পরামর্শ চাই। না না, পরামর্শ নয়, তোমার সাহায্য চাই। পারবে আমাকে সাহায্য করতে!        

আমি আশ্চর্য, স্যারের মুখে এ কি সুর!        -বলুন স্যার, আমার এই দেহ মন প্রাণ জীবন যা কিছু আছে, সবই আপনার জন্য নিবেদিত! কি করতে পারি স্যার আপনার জন্য? কাঁদা থেকে তুলে আপনি যে ছেলেটির মধ্যে পদ্ম ফুটিয়েছেন, তাকে এভাবে বলতে হবে কেন স্যার, আপনি নির্দেশ করুন শুধু!         -শুনো অমল। আজ আমি কোনো শিক্ষক নয়, ডাক্তার নয়, অভিভাবক নয়- শুধু এক পিতা।এক বিপন্ন পিতা। সেই সঙ্গে এক অসহায় স্বামী। অপর্ণা, আমাদের মেয়ে…        -কি হয়েছে স্যার, অপর্ণার কি হয়েছে?        -হবার যা হয়ে গেছে। যা হয়নি, হয়তো হবেও না, তাই নিয়ে আমি আজ বিব্রত!        

এরপর ঘটনা বললেন।        এমবিবিএস ভর্তি হবার পর ফুটফুটে মেয়েটা আরও চঞ্চল হয়ে উঠলো। বন্ধু বান্ধব, হৈ হুল্লোড় পার্টি এসব নিয়ে তার কি যে মত্ততা! আমরা ভাবলাম যথেষ্ট বয়স হয়েছে। হৈহুল্লোড়ের মধ্যেও তার ভালমন্দ বুঝার লায়েক হয়ে উঠেছে। তেমন কিছু বলার ও অবকাশ হতো না, কারণ একটির চেয়ে একটি সেমিস্টারে বেটার পারফর্ম করে যাচ্ছিল। ফোর্থ ইয়ার, জানো তো, খুব ভাইটাল ইয়ার। হঠাৎ করে কেমন আনমনা হয়ে পড়লো। এমন ছটফটে মেয়েটা কেমন যেন মনমরা। মাঝে মাঝে ক্লাসে অনুপস্থিত হতে লাগলো। মার কাছ থেকেও দূরে থাকতে চায়। মা লক্ষ্য করেন। জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যায়। বিষয়টি আমি তেমন লক্ষ্য করিনি। একদিন তার মা বললেন সবকিছু। বললাম, আমি সরাসরি ইনভল্ব হচ্ছি না। তুমি একদিন ঠিক পাকড়াও করো। বিষয়টির খোলাসা করতেই হবে!        

কথামতো অপর্ণার মা এক সুযোগে তার রূমের দরজা বন্ধ করে জেদ ধরে বসলেন সবকিছু আজ বলতেই হবে। অবশেষে যা বেরিয়ে এলো, শুনে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! তিন মাস ধরে তার ম্যানসট্রেশন বন্ধ! ওই যে ওড়িয়া ছেলেটি- নলীন না কি!        লাজলজ্জার মাথা খেয়ে একদিন ডেকে আনলাম নলীনকে। তার মনোবাসনা কি জানতে চাইলাম। ভুল স্বীকার করে বললো তারা একে অপরকে খুব ভালোবাসে। বিয়ে করে প্রায়শ্চিত্ত করতে রাজি।

কিন্তু ইন্টার্নশিপটা শেষ হওয়া পর্যন্ত ! তাই অপর্ণাকে একটি রিস্ক …. ! অপর্ণা এদিকে আড়ি ধরে বসে আছে, না ভুল যা হবার হয়ে গেছে, ভুলের পুনরাবৃত্তি সে করতে চায় না! শেষ পর্যন্ত কথা হলো সামার ভ্যাকেশনে সে বাড়ি যাচ্ছে। ফেরার সময় তার বাবা-মাকে নিয়ে আসবে। এবং সামাজিকভাবে …. ।        ভ্যাকেশনের পর নলীন ফিরে এলো ঠিক, কিন্তু বাবা-মাকে নিয়ে নয়, একটি ক্যাসেট নিয়ে। তার বাবার অডিও বার্তা। তিনি খুব আহ্লাদিত এই সম্বন্ধের সংবাদ শুনে। কৃতজ্ঞতার সাথে তিনি তা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কোর্সটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। তাই ডাক্তার হিসেবে যা আবশ্যক, তা পালন করতে সবিনয় আবেদন জানাচ্ছেন!        ততোক্ষণে অপর্ণার পাঁচ মাস! ইতস্তত করে কাটাবার সময় আর মোটেই নেই। জবরদস্তি তাকে নিয়ে গেলাম …….. । সঙ্গে নলীনও। মিথ্যা পরিচয় দিয়ে এ্যবর্শনের ব্যবস্থা করলাম। নিজের পরিচয় লুকিয়ে! এক প্রাইভেট হাসপাতালে। প্রথমে ডাক্তার সম্মত নয়। সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। রিস্ক হতে পারে। জোরাজুরি আর টাকার লালচ দিয়ে সম্মত করলাম। টার্ম কণ্ডিশনে সাইন করতে হলো নলীনকে।  বেনামে।        

কিন্তু আশঙ্কা যা ছিল, তা ই হলো। ডাক্তার অবশেষে জানিয়ে দিলেন এ্যবর্শন তো হয়ে গেছে, কিন্তু অপর্ণা আর কখনো মা হতে পারবে না! বজ্রাহতের মতো ফিরে এলাম সবাই। কিন্তু এই সন্ধিক্ষণে নলীন এগিয়ে এলো দেবদূত হয়ে। নলীন কথা দিয়েছে- যা হবার হয়ে গেছে, তার ভুলকে সে তার জীবন দিয়ে শুধরে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ধীরে ধীরে অপর্ণা চাঙ্গা হয়ে উঠতে লাগলো। ক্লাসে যেতে শুরু করলো । এবং এবছরই শেষ হলো তাদের ইন্টার্নশিপ। এই সময়ের জন্য যেন অপর্ণার মা বেঁচে আছেন। সেই অঘটনের সময় থেকে ওর ডায়বেটিস আর প্রেসার নিয়ন্ত্রণে রাখা মুশকিল হয়ে উঠছিল। যাক, শেষ পর্যন্ত প্রতীক্ষার অন্ত। এবার মেয়েটিকে হস্তান্তর করেই যেন …… !        কিন্তু এহ বাহ্য ! এইটুকু ও আমাদের কপালে সইছিল না!        ডিগ্রির কাগজপত্র নিয়ে নলীন ঘরে গেলো এক সপ্তাহের মধ্যে তার গুরুজনদের নিয়ে আসতে। এক দুই সপ্তাহ করে এক মাস, দুই মাস পার হয়ে গেছে। নলীনের খবর নেই। এদিকে অপর্ণার মায়ের শারীরিক অবস্থায় ক্রমাগত অবনতি ঘটছে। যে ফোন নম্বরটি ছিল, সে ও অকেজো। গতিক ভালো নয় দেখে নিজেই গেলাম উড়িষ্যায়, তাদের জেলায়। কিন্তু সে বাড়িতে নেই। কিছু জরুরী কাজে নাকি দিল্লি গেছে। ফিরে এলেই তারা আসছেন! আরও একমাস। ফের গেলাম। এ যে বিয়ে বাড়ির পার্টি চলছে। লোকজন বললো গতকাল ডাক্তার বাবুর বিয়ে হয়েছে। কালেক্টরের মেয়ের সাথে। আজ পার্টি। আজ সকালেই ফিরলাম। তার মাকে বললাম আগামী পনেরো তারিখ বিয়ে। শুনে বেচারি বিছানা থেকে উঠে বসেছেন। ভরসা হলো অন্তত আরও পনেরো দিন টিকবে মানুষটি। তারপর তোমাকে ডেকে পাঠালাম। বাবা অমল, তোমার কাছে এবার এইটুকু মিনতি, যেমন করে হোক একটি ছেলে যোগাড় করে দাও, যাতে করে অপর্ণার মাকে দেওয়া সময়ে মেয়েটির হাত ধরিয়ে দিতে পারি! কোনো মতে খেয়ে পরে থাকা পরিবারের হলেও চলবে। অপর্ণা অন্তত একটি সংসার মোটামুটি চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু একটি শর্ত, ছেলেটিকে অসত্য বলা যাবেনা। সে যে কখনো বাপ হতে পারবে না, তার জেনেশুনেই ‌গ্রহণ করতে হবে মেয়েটিকে।      

 -কিন্তু স্যার, অপর্ণা কি রাজি হবে নলীনের এই বিশ্বাস ঘাতকতার খবর জানার পর?        -দেখো অমল, অপর্ণা ও এখন খুব আপসেট, সে জানে তার মায়ের অসুখের মূল কারণ তার ওই অনাকাঙ্ক্ষিত অনৈতিক আচরণ! এবং টিকে যে আছেন কেবল তার একটি সংসার হচ্ছ- এইটুকু দেখার জন্যই! তাই আমি নিশ্চিত সে তার মাকে বারবার হত্যা করার পাপ আর করবে না! তার মা এখন আর চেহারা দেখে ধরতেও পারবেন না নলীন অ-নলীনের তফাৎ।        -ঠিক আছে স্যার, একটি সম্ভাব্য ছেলের খবর আছে আমার কাছে।দেখি এ্যপ্রোচ করে। যদি সম্মত হয়ে যায়, কালই আপনাকে জানাচ্ছি।        পরদিন বিকেলবেলা ফের পৌঁছে গেলাম স্যারের ঘরে। পাত্র ছেলেটির পরিচয় দিলাম স্যারকে। আঁৎকে উঠলেন স্যার! এ কি বলছো বাবা, তুমি ব্রাহ্মণের ছেলে, আর আমরা কায়স্থ! না না, এ হতে পারেনা! তাছাড়া তোমার সামনে কত উজ্জ্বল রঙিন স্বপ্ন। তোমার একটি সংসার হবে, একটি দুটি কচিকাঁচা হবে! কোন জায়গায় তোমার কিছু কমি আছে! না অমল, এরকম মজাক করোনা! আমি সিরিয়াসলি বলছি, তুমি বিকল্প চিন্তা করো!        -স্যার, আপনিই তো বলেছিলেন অপর্ণাকে জেনেশুনে যে বিয়ে করতে চাইবে, তার হাতেই তুলে দেবেন! আর আমি আজ শুধু আমার ইচ্ছা প্রকাশ করতে আসিনি, এসেছি আমার পুরো পরিবারের সম্মতি নিয়ে!        বিয়ে ঠিক সেই পনেরো তারিখেই হয়েছিল। আমাদের সেই জেলা হাসপাতালে অপর্ণার ও পোস্টিং হয়ে গেলো। দুই বছরের মধ্যে আমার পিএইচডি কমপ্লিট হয়ে যাবার পর ফিরে এলাম সেই মেডিক্যাল কলেজে, যেখানে করেছিলাম মেডিক্যাল কোর্স। এবার ফ্যাকাল্টি হয়ে।         আর হ্যাঁ, বলা হয়নি, আমাদের বিয়ের একমাস পরই বিদায় নিয়েছিলেন অপর্ণার মা, আমার শ্রদ্ধেয় শাশুড়ি মা।        অপর্ণা এবার  পিজিতে ভর্তি হলো- গায়নোতেই। এরপর দুজনেই ফ্যাকাল্টি- সেম ডিপার্টমেন্ট। হ্যাঁ, স্যার অবশ্য আমাদের দুজনকে তাঁর স্বপ্নের এবং আজীবন সেবা করে যাওয়া মেডিক্যাল কলেজের ফ্যাকাল্টি হিসেবে দেখে, আশীর্বাদ দিয়ে বিদায় হয়েছিলেন।        কুড়ি বছর শিক্ষকতা আর মেডিক্যাল সার্ভিস দেবার পর দুজনেই স্বেচ্ছা-অবসর নিয়ে পার্টটাইম প্রাইভেট সার্ভিস করছিলাম একটি প্রাইভেট হাসপাতালে। কিন্তু বছর খানেক পর সেখান থেকেও বিচ্ছিন্ন হতে হয় আমাদের। আমাদের চিকিৎসায় কত নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান লাভ করছেন, তার ঠিক হিসেব রাখা হয়নি। কিন্তু এরপরও আড়ালে আবডালে আমাদের শুনতে হতো অনেক শ্লেষ এবং পিঞ্চিং!

এতো ভালো ডাক্তার যদি, সার জীবনে কেন তাদের একটি সন্তানও হলো না! এসব বিদ্রূপ করে অনেক পেশেন্টকে অন্য ডাক্তাররা হাতিয়ে নিতেন বটে, কিন্তু ফাইন্যালি অনেকেই ফিরে আসতো। আর এসব ব্যঙ্গ বিদ্রুপ শুনে অপর্ণা একেবারে ভেঙে পড়তো। ঘরে ফিরেই একই কথা- আমার ভুলের জন্য ……… ! প্রতিজ্ঞা করতো আর বেরোবে না ঘর থেকে। ফের জোর করে নিয়ে যেতাম। জানতাম যে ঘরে বসে থাকলেই ও অসুস্থ হয়ে পড়বে! একই কথা নিয়ে হতাশায় ঝরে পড়বে।        অবশেষে দুজন দুই ভিন্ন হাসপাতালে। আছি জড়িয়ে এখনও।        

শেষ কথা বলে নিই। ভাববেন না আমরা একেবারে নিঃসন্তান। বিয়ের পর থেকে প্রতি বছর ভর্তির পর আমরা দুজনে দুটি করে, মোট চারটি ‘অমল-অপর্ণা’ খুঁজে নিই আমাদের অথবা অন্য মেডিক্যাল কলেজ থেকে। সর্বোচ্চ ডিগ্রি পর্যন্ত যা তারা পড়াশোনা করতে চায়, তাদের পথের পাথেয় যুগিয়ে যাই, যুগিয়ে যাচ্ছি আজও ।        রাত দুটোর পর সজ্জা গ্রহণ করেছিলাম দুজনে !                    

By  –এফ,এম, ইকবাল॥ 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *