বর্তমান যুগে নারী শিক্ষার গুরুত্ব

আমাদের দেশে বর্তমানে যে সময় এসেছে, তাতে দেখা যায় যে নারী শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, একজন নারী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলে শুধু একটি পরিবারই নয়,একটি ভালো সমাজ ও গঠন করতে পারে। ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, অনেক মহাপুরুষের নারী শিক্ষার প্রতি অনেক অবদান রয়েছে, যেমন ভারতে লীলাবতী একজন মহান গণিতজ্ঞ ছিলেন। প্রাচীন যুগের তিনি লোকের অনুপ্রেরণা ছিলেন, সেই যুগেও নারীশিক্ষাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দেওয়া হয়েছিল। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন “একজন সুশিক্ষিত মাতা একশোজন সুশিক্ষিত সন্তানের জন্ম দিতে পারে”। উনার এই উক্তি থেকে আমরা বুঝতে পারি যে একজন নারী শিক্ষা সমাজের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সকলেই প্রথম শিক্ষা পরিবার থেকে পেয়ে থাকি। তাই একজন “মা” যদি সুশিক্ষিত হয় তাহলে সে তার সন্তানকে ও সুশিক্ষিত করতে সক্ষম হবে। বর্তমান যুগেও আমাদের দেশে “বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও” পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। নারী শিক্ষা উন্নতির জন্য এই প্রকল্পটি আরম্ভ করা হয়েছে 2015 সালে 22 জানুয়ারি। তাই আমরা নারী শিক্ষার দিকে যত বেশি আলোকপাত করব আমাদের সমাজ উন্নতশীল থেকে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।

নারী শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে আজ কোনো সন্দেহ নেই। নারীরা দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেক থেকে বেশি। তাই এ নারীদের অশিক্ষার অন্ধকারে রেখে জাতি কখনো উন্নতি করতে পারে না। এক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-
রাজা করিতেছে রাজ্য শাসন, রাজারে শাসিতে রানি,
রানির দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি।”
তাই জাতিকে উন্নতি করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। নারীর ভূমিকা মা হলে ও রাষ্ট্রেয় ও অর্থনীতিতে ব্যবসার বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আজ নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পুরুষের সাথে নারী কল কারখানায়, মাঠে কাজ করছে। নারীরা এখন প্রধানমন্ত্রীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। তাই নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয় অপরিসীম।

একজন সুশিক্ষিত মাতা জন্ম দিতে পারে একজন সুশিক্ষিত সন্তান, করতে পারে তাকে নিজের আর্দশে আর্দশিত। কারণ ছেলে মেয়েদের উপর মায়ের প্রভাবই বেশী পড়ে। মায়ের কাছ থেকে তারা আচার আচরণ ইত্যাদি শিক্ষা গ্রহন করে থাকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীদের প্রভাব সম্বন্ধে বলতে গিয়ে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।”
স্বাবলম্বিতা অর্জনে নারী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকালে নারীরা সবকিছুর জন্য তাদের স্বামীদের উপর নির্ভরশীল ছিল। তারা ছিল অবহেলিতা নির্যাতিতা। গৃহ মধ্যেই তাদের কার্যাদি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আজ নারীরা শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষিকা, পুলিশ অফিসার ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছে। তারা আজ সম্পূর্ণরুপে স্বাবলম্বী। সুতরাং আজ আর নারীকে অবহেলা করা কোনো সুযোগ নেই। কবিকন্ঠের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে বলতে হয়-
“সে যুগে হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল নাক
হারীরা আছিল দাসী”
গৃহস্তালি কাজের দিকে তাকালেও দেখা যায় নারী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম । শিক্ষিতা নারীরা সন্তানের অসুখে-বিসুখে যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সেবা,শুশ্রুষা ও সংসারের প্রাত্যহিক আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ করতে পারে, অশিক্ষিত নারীরা সেভাবে করতে পারে না। শিক্ষিতা নারীরা হাতে যদি সংসারের ভার ন্যস্ত থাকে তাহলে সংসারের উন্নতি হবেই। তাই মেয়েদেরকে পুরুষদের ন্যায় শিক্ষিত করে তোলা অত্যাবশ্যক।

দেশ গঠনেও নারী শিক্ষার গুরুত্ব অনেক। অতীতে দেশ গঠনে নারীদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। বর্তমানেও দেশ গঠনে নারীদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।ভাষা আন্দোলন থেকে এ পর্যন্ত যতটি আন্দোলন হয়েছে প্রত্যেকটি আন্দোলনে নারীদের কিছু না কিছু অবদান রয়েছে। আর এ অবদান রেখেছে শুধু শিক্ষিতা মেয়েরাই। তাই দেশ গঠনে নারী শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
যুগে যুগে শিক্ষিত নারীরা তাদে কর্মপ্রচেষ্টা দ্বারা পৃথিবীতে অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, রাশিয়া, আয়ারল্যান্ড, সুইজেন, নরওয়ে, প্রভৃতি, দেশের নারীরা সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা, আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিভা পাতিল, বেনজীর ভুট্টো, ইন্দিরা গান্ধী, সোনিয়া গান্ধী, শ্রীমাভো বন্দরনায়েক, মার্গারেট থ্যাচার, হিলারী ক্লিনটন, কন্ডোলিৎসা, রাইস প্রমুখ এবং তাদের শিক্ষা ও মেধা দ্বারা মহিলা হয়েও বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

নারী শিক্ষা বিস্তারের জন্য কতিপয় কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। যেমন- দেশে নারী শিক্ষার্থীর অনুপাতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বয়স্ক নারীদের শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, নারী শিক্ষা প্রসারের জন্য সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের উদারনীতি ইত্যাদি।

কোনো কালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়ী লক্ষ্মী নারী।”
সুতরাং নারীকে পশ্চাতে রেখে উন্নতির প্রত্যাশা করা দুরাশারই শামিল। তাই অজ্ঞানতার অশুভ অক্টোপাস থেকে নারীকে মুক্ত করতে হবে। আর একমাত্র উপযুক্ত শিক্ষাই বাতলে দিতে পারে নারী মুক্তিরর পথ।

পায়েল দাস
শিক্ষিকা এংলাবাজার পাবলিক হাই স্কুল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *