‘মানুষ’ ডাক্তার

ডাক্তারদের প্রতি আজকাল বহু মানুষের ক্ষোভ এবং উষ্মা পরিলক্ষিত হয় । সমাজে কিছু সংখ্যক ডাক্তারের অনভিপ্রেত আচরণ এবং অর্থগৃধ্নুতা অবশ্যই তার জন্য দায়ী। গতকাল ফেসবুকে একটি পোস্ট চোখে পড়লো কোথাকার, জানিনা কোন দেশেরই বা, জনৈক ডাক্তারের ভিজিট চার্ট । প্রথম ভিজিট ১২০০ টাকা , সাতদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেখানোর চার্জ …… ‌ টাকা- ইত্যাদি । এরমধ্যে আজকাল নাকি আবার দালাল ও ধরতে হয়, নইলে এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যায়না । যে ডাক্তারদের মানুষ দেবদূতের সম্মান দিয়ে থাকে, কিছু সংখ্যক ডাক্তারের এধরনের অমানবোচিত আচরণ সত্যিই সমাজে এক নঞর্থক বার্তা ছড়িয়ে দেয় । ।


কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা কিছু ‘মানুষ’ ডাক্তার ও রয়েছেন, যারা সাধারণত পাদপ্রদীপের আড়ালেই রয়ে যান । আজ সেরকম দু-এক জন মানুষ ডাক্তারের কথা বলি । নাম বলবো না, শুধু বিশেষণ ।
বহু বছর আগের কথা। গৃহজেলার সদরে এক মসজিদ থেকে যোহরের নামাজ পড়ে বেরিয়েছি। বেলা প্রায় দুটো। সামনেই আমাদের গ্রামের ফখর চাচা। -চাচা, কোনো কাজে এসেছিলেন? একান্ত আবশ্যক না হলে এরা শহরে আসার কথা তো নয়।


-অনেক কথা।
বিস্তারিত বললেন। ছোট ভাইয়ের বহুদিন ধরে মাথা ব্যাথা। সবসময় যেন কিছু কামড়ায় মাথায়। আইজল থাকতো। কাজকর্ম কিছু করতে পারে না, তাই ফিরে এসেছে। ডাক্তার দেখিয়েছেন সিভিল হাসপাতালে। দুরত্ব ২৭ কিলোমিটার। তিন চারদিন আসার পর টেস্ট হয়েছে। রিপোর্ট পেয়ে অপারেশনের তারিখ দেওয়া হয়েছিল আজ। সকাল নয়টায় পৌঁছেছিলেন। বারোটা পর্যন্ত হাসপাতালে। হলোনা। ডাক্তার বললেন অমুক জায়গায় চেম্বারে গিয়ে অপেক্ষা করতে। পৌনে দুটোয় বললেন আজ হবেনা, রোগী বেশি, ….বার এসো। ঠিক আজকের মতো কিছু না খেয়ে। তাই এখন ভাবছেন সারাদিনের উপোস ভাইকে নিয়ে কিছু খাবেন। তারপর নামাজ আদায় করে বাড়ি যাবেন।


জিজ্ঞেস করলাম এখনও কিছু খায়নি তো? -না , শুনে বললাম এক কাজ করো, আগে নামাজ পড়ে নাও। কাগজগুলো হাতে নিয়ে নিলাম। আর বললাম আমি না ফেরা পর্যন্ত ওকে কিছু খেতে দিও না।
সন্নিকটে ছিল অন্য এক ডাক্তার বাবুর চেম্বার। সার্জারির ই। চেনাজানা ‌। মানুষ ডাক্তার। রিপোর্ট ফাইল নিয়ে গেলাম সেখানে। ভীড় ছিলনা- যেহেতু উনার ফেরার সময়। ঢুকে গেলাম। কাহিনি বর্ণনা করার পর জিজ্ঞেস করলেন ও কিছু খেয়ে নিয়েছে? -না বলাতে বললেন নিয়ে এসো ওকে।


অপারেশন টেবিলে রোগীকে তুলে কেন জানি আমাকেও ডাকলেন ভেতরে। লোকেল এ্যনেস্থেশিয়া ব্যবহার করেই তার সাথে গল্প জুড়ে দিলেন। -বয়স কত? বিয়ে করেছে কি না? কখন করবে- ইত্যাদি। লজ্জায় সে কাঁচুমাচু করছে, আর এদিকে কাজ চলছে। নির্দিষ্ট জায়গা কেটে বের করে আনলেন একটি পোকা ! জিন্দা! দুধে-আলতা রঙ। নড়ছে! এগিয়ে দেখালেন। রাখলেন পাত্রে। সেলাই বেণ্ডিজ শেষ! এক টুকরো কাগজে মোড়ে নিয়ে এলাম পোকাটি। চাচার হাতে দিলাম।
-কত দেবো?
-দিয়ে দিন কিছু একটা।
পাঁচশো টাকার নোট থেকে … ফিরিয়ে দিলেন।
স্বস্তির নিঃশ্বাস। চাচার বেঁচে গেছে হাজার দুয়েক। তাই মিষ্টি খেতেই হলো ।
দেখতাম অন্যান্য রোগীর সাথে গ্রামগঞ্জের যত নিম্নবিত্ত দরিদ্র আর মিসকিন রোগীদের ভীড় এই ডাক্তার বাবুর চেম্বারে। যাদের থেকে ফি নেবার ঠিকই নিতেন। অনেককে আবার দিতেন। পিএস দিয়েও বাদবাকি ওষুধের পয়সা, কোনো ক্ষেত্রে শিশুর পুষ্টিকর খাদ্য ক্রয়ের জন্য আবশ্যক টাকাপয়সা ও দিতেন। তার চাইতে বড় কথা, এই গ্রামীণ মহিলাদের আবার স্পাই হিসেবে ব্যবহার করতেন! কিভাবে? তাদের গ্রামে কয়জন এবার মেট্রিক পাশ করলো, গরীব মেধাবী ছাত্র আছে কি না, থাকলে সেই ছেলেটিকে অথবা মেয়ের বাবাকে একবার দেখা করতে বলতেন। তারপর তারা পড়াশোনা করতে পারতো। তাদের অক্সিজেনের সোর্সটা রয় যেতো অজ্ঞাত। এভাবে অনেক .. ! দেখাসাক্ষাৎ নেই দুই দশকের ও অধিক সময় ধরে। সুস্থ থাকুন। দীর্ঘায়ু হোন- এইটুকু কামনা।


আরেকজন ‘মানুষ’ ডাক্তারের কথা। ১৯৮৪ । মা’য়ের অবস্থা ভীষন সংকটজনক। ভরসা প্রায় শেষ। গ্যাস্ট্রিক আলসার অপারেশন হয়েছিল ১৯৭৬এ। শিলচর মেডিকেল সিভিলে থাকার সময়। রোগ ফিরেছিল ৭৯এ। এক দুই করে তেইশবার শিলচর মেডিকেল নিয়েও কিছু হয়নি। অপারেশন আবশ্যক, কিন্তু সম্ভব হয়না উচ্চ রক্তচাপের জন্য। চুরাশির প্রথম দিকে অবস্থা হতাশাজনক। খবর পেয়ে কুয়েত থেকে বড়দাও এসেছেন। পারিবারিক আলোচনায় সিদ্ধান্ত হলো ডিব্রুগড় মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হবে। শুনা গেছে সেখানে এক সুদক্ষ ডাক্তার। বরাক উপত্যকারই। লোকে নাকি বলে কসাই, গেলেই অপারেশন ! কিন্তু আমাদের কেসটা যে ক্রিটিক্যাল। তাই সিদ্ধান্ত হলো আব্বার সাথে ভাইয়েদের কেউ একজন যাবে। ‘বাইরে একলা মরা টানাটানি মুশকিল অইবো’- এই গ্রাউন্ডে। সবাই হতাশ । সিলেকশন হলো সঙ্গে যাবো আমি।
ডিব্রুগড় পৌঁছে হোটেলে উঠলাম। পরদিন সকালে ডাক্তার বাবুর ঘরে। টেস্ট করতে দিলেন অনেকগুলো। পাঁচদিন হোটেলে থেকে সব টেস্ট সম্পন্ন হলো। মঙ্গলবার এডমিশান। অপারেশনের তারিখ বৃহস্পতিবার। বুধবার সন্ধ্যার পর আব্বা গেলেন ডাক্তার বাবুর ঘরে। নরম মনের চাহিদা- কিছু পয়সা পাতি… । ডাক্তারবাবু এমন ধমকি দিলেন- ডিব্রুগড়ে বুঝি টাকাপয়সার এতো অভাব যে করিমগঞ্জ থেকে এসে টাকা দিতে হবে ‍? ফিরিয়ে দিলেন। আর হ্যাঁ, বলে দিলেন টাকাপয়সা যদি খরচ করতেই হয়, চলে যান মোকাম কবরিস্থানের ওখানে। অনেক ভিখারি ফকির রয়েছেন, তাদের দিয়ে দেবেন। শঙ্কা ! কথায় বলে- দূর্বল অন্তর আর দূর্বল স্থিতিতে শঙ্কা আর আশঙ্কার ফলন ভালো হয়। আব্বা গিয়েছিলেন কবরিস্থান। গরিব গুরবোদের কি দিয়েছিল জানিনা, কিন্তু ভালোই জেনেছিলাম যে হাসপাতালে কোনো রোগীর মৃত্যু হলে কাফন-দাফনের ব্যবস্থাপনা কেমন করে করতে হয়, তার বিস্তারিত তথ্যপাতি সংগ্রহ করে এসেছেন!


বৃহস্পতিবার অপারেশন হয়েছিল। দুদিন মাঝে, রোববার ছুটি ! এতো কাঁচা অপারেশন! ৬১৩ কিলোমিটার পথ ডিব্রুগড় থেকে আসিমগঞ্জ! মিটার গেজ কু-ঝিক ঝিক। লামডিং- এ ট্রেন বদল । মধ্যরাতে ধর্মনগর পেসেঞ্জার ট্রেন! না, সম্ভব নয়, ডাক্তারই বললেন হোটেলে দুই তিন দিন থেকে যাও। আর হ্যাঁ, চেক-আপের জন্য এখানে আর আসতে হবেনা। শিলচরে ডাক্তার …..কে দেখালেই হবে। মানুষ ডাক্তার!
আরও এক ডাক্তারের কথা বলে শেষ করছি। লেডি ডাক্তার। চেনাজানা। অফিসে আর চেম্বারে এমআররা ভিজিট করতে আসেন। স্যাম্পল দিয়ে যান। ডাক্তারনির সোজা কথা- ঠিক আছে স্যাম্পল রেখে যান। পেশেন্টকে দেবো। রেজাল্ট ভালো হলে অবশ্যই লিখব। কিন্তু আপনাদের কমিশনের জন্য মোটেই নয়। একটি দরিদ্র পরিবারের রোগিকে অনাবশ্যক দেড়শো টাকার ভিটামিন গিলিয়ে আমার কমিশন নেবার কোনো আবশ্যকতা নেই! হবেই না কেন এই মানসিকতা, যে মেয়েটি ইন্টার্নশিপ করার সময়ে চা- শ্রমিক মহিলার বাচ্চার সুচিকিৎসার জন্য তার বাবার কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে নগদ টাকা দিয়ে সহায়তা করেছিল। এবং তার বাবা নাকি এই কাজের জন্য গর্ব করে তাকে বিশেষ গিফট দিয়েছিলেন, সে আজ মানুষের চিকিৎসা মানুষের মতোই করে যাবে, এ তো স্বাভাবিকতা।

By আ,ফ,ম, ইকবাল॥

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *